The website is currently under development
শুধু জরিমানা করে বাংলাদেশে শৃঙ্খলা আনা যাবে না
অসুস্থ বাবার ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে ১১ বছরের একটি শিশুর রাস্তায় বের হওয়া কোনোভাবেই আইনহীনতার পক্ষে যুক্তি নয়। বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনকল্যাণ, মানুষের অংশগ্রহণ এবং দৈনন্দিন নগর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নিয়ম শেষ পর্যন্ত তাদের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা হারায়। বাংলাদেশের পরিকল্পনা ব্যবস্থার ব্যর্থতাও একই সমস্যারই অংশ।
CLIMATE, ENVIRONMENT & PLACEALL TOPICSMURSHED AHMEDPOLITICS, GOVERNANCE & SOCIETY
Murshed Ahmed
8/7/20262 মিনিট পড়ুন


সম্প্রতি ১১ বছর বয়সী এক ছেলের একটি ঘটনা আমার নজরে আসে। পরিবারের আয়-রোজগারে সহায়তা করার জন্য সে তার বাবার ব্যাটারিচালিত ‘ইজি বাইক’ নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, দুই ব্যক্তি তাকে প্রতারণা করে গাড়িটি চুরি করে নিয়ে যায়। ঘটনাটি আইন ও নৈতিকতার মধ্যে এক অস্বস্তিকর সংঘাত সামনে আনে। চুরি যে স্পষ্টতই অন্যায়, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। একইভাবে, একটি শিশুর জনসাধারণের সড়কে মোটরচালিত যান চালানোও অনিরাপদ এবং প্রচলিত লাইসেন্সিং ব্যবস্থার দৃষ্টিতে বেআইনি। বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর।[1] অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ইজি বাইকের আইনগত ও নিয়ন্ত্রক অবস্থানও বছরের পর বছর ধরে অস্পষ্ট থেকেছে। নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ এবং অসম্পূর্ণ লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সঙ্গে বাস্তবে রাস্তায় যা ঘটছে, তার বারবার অসামঞ্জস্য দেখা গেছে।[2]
কিন্তু আমরা যখন প্রশ্ন করি, শিশুটি কেন সেখানে ছিল, তখন ঘটনাটির অর্থ অন্যভাবে ধরা দেয়। জানা যায়, তার বাবা, যিনি পরিবারের ইজি বাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, গুরুতর লিভারের রোগে ভুগছিলেন এবং পাশাপাশি স্ট্রোকও করেছিলেন। ফলে তিনি আর কাজ করতে পারছিলেন না। কিন্তু আইন বলেছে ১১ বছরের একটি শিশুর গাড়ি চালানো উচিত নয় বলে পরিবারের দৈনন্দিন খরচ তো থেমে থাকেনি। পর্যাপ্ত আয় বা কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় পরিবারটির খাবারের ব্যবস্থা করতেই ছেলেটি বাবার গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল।
এই বাস্তবতা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালানোকে নিরাপদ করে দেয় না। একইভাবে, দারিদ্র্যও প্রতিটি বেআইনি কাজকে বৈধ করে তোলে না। ঘটনাটি সত্য হলে, যারা গাড়িটি চুরি করেছে তারা চোরই থাকে। শিশুটিরও গাড়ি চালানো উচিত ছিল না। কিন্তু কোনো রাষ্ট্র যদি শুধু আইনভঙ্গটুকুই দেখে, অথচ যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সেই আইনভঙ্গের জন্ম দিচ্ছে তা না দেখে, তাহলে যে সমস্যাটি সে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, সেই সমস্যাটিকেই সে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।
একটি পরিণত রাষ্ট্র সে নয়, যে প্রতিটি ধূসর ক্ষেত্রকে সম্পূর্ণভাবে দূর করে দেয়। বরং পরিণত রাষ্ট্র হলো সেই রাষ্ট্র, যে জানে কীভাবে এসব ধূসর ক্ষেত্রকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হয়, যাতে সেগুলো দায়মুক্তির সুযোগে পরিণত না হয়।
গুজরাটের একটি পানির ট্যাংকার
বহু বছর আগে, ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডে মাস্টার্স পড়ার সময় আমি এমন একটি কোর্স নিয়েছিলাম, যেখানে অবকাঠামোকে শুধু প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় হিসেবেও বিশ্লেষণ করা হতো। স্টিভ কনেলির নেওয়া একটি ক্লাস আজও আমার মনে গেঁথে আছে। তিনি ভারতের শুষ্ক রাজ্য গুজরাটের একটি ছবি দেখিয়েছিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল, ট্যাংকার ওয়াগনে পানি বহনকারী একটি মালবাহী ট্রেন থেমে আছে, আর স্থানীয় মানুষ সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করছে।
ঘটনাটির সরাসরি আইনি ব্যাখ্যা খুব সহজ। পানিটি অন্য কারও মালিকানাধীন ছিল। অনুমতি ছাড়া তা নেওয়াকে চুরি বলা যেতে পারে। কিন্তু ক্লাসে যে কঠিন প্রশ্নটি তোলা হয়েছিল, সেটি ছিল অন্যরকম: বেঁচে থাকার জন্য নেওয়া পানিকে কি নৈতিকভাবে ঠিক একই শ্রেণিতে রাখা উচিত, যে শ্রেণিতে বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে অন্যের সম্পদ নেওয়াকে রাখা হয়?
এই প্রশ্নের অর্থ এই নয় যে প্রয়োজন দেখা দিলেই আইন আপনাআপনি অকার্যকর হয়ে যায়। বরং যুক্তিটি হলো, জননীতি শুধু আইনি শ্রেণিবিন্যাসের জায়গায় এসে থেমে থাকতে পারে না। পানি জীবনের জন্য অপরিহার্য। জাতিসংঘ নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং স্যানিটেশনে প্রবেশাধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেখানে সহজপ্রাপ্যতা ও সামর্থ্যের মধ্যে থাকা এর মৌলিক উপাদানগুলোর অন্তর্ভুক্ত।[3] যদি বেঁচে থাকার একটি অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণ করতে মানুষকে নিয়ম ভাঙতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সামনে একটি নয়, দুটি সমস্যা রয়েছে। প্রথমটি হলো তাৎক্ষণিক আইনভঙ্গ। দ্বিতীয়টি হলো সেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, যা ওই আইনভঙ্গকে মানুষের কাছে যৌক্তিক করে তুলেছে।
এই কারণেই প্রযুক্তিগতভাবে যথার্থ কোনো নীতিও ব্যর্থ হতে পারে। একজন প্রকৌশলী সঠিক ব্যাসের পাইপ নির্ধারণ করতে পারেন, একজন পরিবহন পরিকল্পনাবিদ নিরাপদ যানবাহনের মানদণ্ড ঠিক করতে পারেন, এবং একজন আইনজীবী সম্পূর্ণ সুসংগত একটি নিষেধাজ্ঞাও প্রণয়ন করতে পারেন। কিন্তু সামাজিক ব্যবস্থা যদি মানুষকে সেই নিয়ম পাশ কাটানোর শক্তিশালী কারণ তৈরি করে দেয়, তাহলে এসব ব্যবস্থার কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।
→ All Topics
ছবি: সাকলাইন রিজভী; সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
আইন স্পষ্ট। জীবন ততটা নয়।
বাংলাদেশের জনপরিসরের আলোচনায়, বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের একটি অংশের মধ্যে, বিশৃঙ্খলার প্রতিক্রিয়ায় নতুন নিষেধাজ্ঞা, বড় অঙ্কের জরিমানা কিংবা আরেক দফা অভিযান দাবি করার একটি বিশেষ প্রবণতা দেখা যায়। যানজট ও ট্রাফিক বিশৃঙ্খল, জরিমানা বাড়াও। ভবন নির্মাণে নিয়ম ভাঙা হয়েছে, ভেঙে ফেলো। ব্যাটারিচালিত রিকশা অনিরাপদ, নিষিদ্ধ করো। ফুটপাত দখল করে হকার বসেছে, উচ্ছেদ করো। অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলো পরিকল্পনার মানদণ্ড মানে না, সেগুলো সরিয়ে দাও।
আইনের গুরুত্ব অবশ্যই আছে। একটি কার্যকর সমাজ সড়ক নিরাপত্তা, ভবন নির্মাণের মানদণ্ড কিংবা সম্পত্তির অধিকারকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে পারে না। ভুলটি হয় তখন, যখন ধরে নেওয়া হয় যে আইন না মানার মূল কারণ হলো শাস্তির ঘাটতি। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই আইন অমান্য করা আরও গভীর একটি অসামঞ্জস্যের লক্ষণ, যেখানে আনুষ্ঠানিক বিধিবিধানের সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার আর্থসামাজিক পরিস্থিতির মিল নেই।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আইন প্রয়োগেরও একটি নৈতিক ও বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকারের স্তর রয়েছে। পারিবারিক অসুস্থতার কারণে যে শিশুকে প্রাপ্তবয়স্কের অর্থনৈতিক দায়িত্ব নিতে হয়েছে, তাকে মুনাফার জন্য সচেতনভাবে নিরাপত্তাবিধি এড়িয়ে চলা কোনো পেশাদার চালকের সমতুল্য বিবেচনা করা যায় না। আনুষ্ঠানিক আবাসন বহন করার সামর্থ্য না থাকায় যে পরিবার ধাপে ধাপে নিজের ঘর তৈরি করে, তাদের অবস্থাও বেশি মুনাফার আশায় জেনেশুনে অবৈধভাবে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা কোনো ডেভেলপারের সমান নয়। সুশাসন দুর্বলতা ও শোষণের মধ্যে, প্রয়োজন ও সুবিধাবাদের মধ্যে, এবং পরিবর্তনশীল বাস্তবতার কারণে সৃষ্টি হওয়া অনানুষ্ঠানিকতা ও সচেতনভাবে নিয়মের অপব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করতে জানে।
বাস্তবে আনুপাতিকতা বলতে এটিই বোঝায়। এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রকে নিয়মকানুন ছেড়ে দিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, কোনো নিয়ম প্রয়োগের আগে রাষ্ট্রকে সেই নিয়মের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির বাস্তব অবস্থাটিও বুঝতে হবে।
সামাজিক চুক্তি নিছক আইনি কারিগরি বিষয় নয়
যুক্তিটিকে নাটকীয়ভাবে এভাবে উপস্থাপন করা সহজ: যে রাষ্ট্র তার জনগণের দায়িত্ব নিতে পারে না, সে তাদের কাছে আইন মানার দাবিও করতে পারে না। আক্ষরিক অর্থে এই বক্তব্যটি অতিরঞ্জিত। কল্যাণমূলক ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত হলেই রাষ্ট্র তার সব আইনি কর্তৃত্ব হারায় না। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ব্যর্থতার কথা বলে কোনো চালক বেপরোয়া গাড়ি চালানোর দায় এড়াতে পারেন না।
তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যুক্তির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ীভাবে আইন মেনে চলার সংস্কৃতি শুধু বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করে না। মানুষ তখনই নিয়ম মেনে চলতে বেশি আগ্রহী হয়, যখন তারা বিশ্বাস করে যে প্রতিষ্ঠানগুলো মোটের ওপর পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে কাজ করছে, প্রক্রিয়াগুলো ন্যায্য, আরোপিত বোঝা আনুপাতিক, এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবনের কোনো না কোনো সংযোগ রয়েছে।
যখন এই সম্পর্ক ভেঙে পড়ে, তখন দৈনন্দিন নিয়মভঙ্গ কেবল সুযোগসন্ধানী আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি রাষ্ট্র থেকে এক ধরনের বাস্তব বিচ্ছিন্নতায় রূপ নিতে পারে। মানুষ প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে না। বরং যেখানে আইন প্রয়োগের উপস্থিতি নেই, সেখানে তারা আনুষ্ঠানিক নিয়মকে নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক বলে গণ্য করা বন্ধ করে দেয়। ভবন আগে বাড়ানো হয়, পরে অনুমোদনের চেষ্টা করা হয়। দোকান ফুটপাতের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। বাস যেখানে-সেখানে থামে। রিকশা নিষিদ্ধ সড়কে ঢুকে পড়ে। জলাভূমি ভরাট করা হয়, কারণ সবার ধারণা থাকে, প্রভাবশালী কেউ না কেউ শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যতিক্রমী অনুমোদন আদায় করে নেবে।
এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষতিকর শাসনচক্রগুলোর একটি। উচ্চাভিলাষী নিয়ম প্রণয়ন করা হয়, কিন্তু তা মানার হার কম থাকে; আইন প্রয়োগ হয় বাছাই করে; জনগণের আস্থা আরও কমে যায়; এরপর সরকার প্রতিক্রিয়ায় আরেকটি নতুন নিয়ম কিংবা আরও বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করে। ফলে আইন কাগজে একই সঙ্গে কঠোর, কিন্তু বাস্তবে দরকষাকষিযোগ্য হয়ে ওঠে।
ইজি বাইকের সমস্যাই ইতোমধ্যে বিষয়টি প্রমাণ করছে
ব্যাটারিচালিত রিকশা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, কারণ রাষ্ট্র বহু বছর ধরে এমন একটি বৃহৎ জীবিকা ও পরিবহন ব্যবস্থাকে এমন এক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে ফেলার চেষ্টা করেছে, যেখানে এই ব্যবস্থাটিকেই যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আদালতের বিধিনিষেধ কিংবা নিষেধাজ্ঞার চেষ্টা এসব যানবাহনকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং এদের সংখ্যা বেড়েছে, কারণ এগুলো বাস্তব কিছু প্রয়োজন পূরণ করেছে: স্বল্প খরচে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াত, যেখানে আনুষ্ঠানিক গণপরিবহন দুর্বল সেখানে সহজ চলাচল, এবং বিপুলসংখ্যক নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থান।
২০২৫ সালের মধ্যে নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা দিতে শুরু করে। নীতিনির্ধারকেরা কম গতির ই-রিকশার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো, চালক প্রশিক্ষণ, ই-রেজিস্ট্রেশন এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় আরও নিরাপদ একটি মডেল তৈরির দিকে অগ্রসর হন। সে সময়ের প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছিল যে প্রচলিত ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর নিবন্ধন নেই এবং চালকদের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও নেই, তবে একই সঙ্গে এটিও স্বীকার করা হয়েছিল যে সেগুলোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার বারবার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।[2] পরে দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি আইনি বিশ্লেষণ আরও সরাসরি মূল বিষয়টি তুলে ধরে: মানুষ যখন এসব যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে সহজলভ্য ও সুবিধাজনক আনুষ্ঠানিক গণপরিবহনের ঘাটতি থাকলে, তখন এগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করার নীতি বাস্তবসম্মত নয়।[4]
বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিতে শুরু করলে মানবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দেখতে ঠিক এমনই হয়। এর অর্থ এই নয় যে অনিরাপদ যানবাহনকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিতে হবে। বরং অনানুষ্ঠানিকতা থেকে বৈধতার দিকে যাওয়ার একটি বাস্তব পথ তৈরি করতে হবে: নিরাপদ নকশা, চালক প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট রুট, নিবন্ধন, রূপান্তরের জন্য সময়সীমা, নতুন বা উন্নত যানবাহন কেনার আর্থিক সহায়তা এবং সত্যিকার অর্থে বিপজ্জনক আচরণের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক আইন প্রয়োগ।
একই নীতি ওই ১১ বছরের শিশুটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত। শিশুটিকে সুরক্ষা দিতে হবে, চুরির অভিযোগ তদন্ত করতে হবে, পরিবারটির তাৎক্ষণিক ঝুঁকি ও অসহায়ত্ব মোকাবিলা করতে হবে এবং যেন একই পরিস্থিতি আবার তৈরি না হয়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। যে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে অক্ষম হয়ে পড়েছেন, সেই পরিবারের ওপর জরিমানা আরোপ করলে হয়তো আনুষ্ঠানিক নিয়মটি রক্ষা করা হবে, কিন্তু একই সঙ্গে সেই হতাশা ও অসহায়ত্ব আরও বাড়তে পারে, যা প্রথমে আইনভঙ্গের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
বাংলাদেশ যে শহর চায়, পরিকল্পনা করে সেই শহরের জন্য, মানুষ যে শহরে বাস করে তার জন্য নয়
একই ধরনের যুক্তিগত ব্যর্থতা আরও বৃহৎ পরিসরে দেখা যায় নগর পরিকল্পনায়। বাংলাদেশে পরিকল্পনার অভাব নেই। শুধু ঢাকাই একের পর এক মাস্টারপ্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যান, পরিবহন কৌশল এবং ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের মধ্য দিয়ে গেছে। গভীরতর সমস্যা হলো পরিকল্পনায় কল্পিত আনুষ্ঠানিক শহর এবং প্রতিদিনের কোটি মানুষের সিদ্ধান্তে বাস্তবে গড়ে ওঠা শহরের মধ্যে দূরত্ব।
বিশ্বব্যাংক বারবার ঢাকার নগরায়ণকে অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা, তীব্র যানজট এবং প্রাতিষ্ঠানিক খণ্ডিততার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ২০১৮ সালে বৃহত্তর ঢাকা নিয়ে তাদের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, নগরায়ণ হয়ে উঠেছিল বিশৃঙ্খল ও অসম, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভূমি উন্নয়নের মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় ছিল না। বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য কাজেও রাজধানীর বাইরের অপরিকল্পিত নগরায়ণের অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে নগর পরিকল্পনার সক্ষমতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।[5]
এই ব্যবধান শহরের প্রায় সর্বত্র দৃশ্যমান। আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ধরে নেয় যে উন্নত সেবা-সংবলিত প্লট থাকবে, ভবন নিয়ন্ত্রণের বিধি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে, পরিবহন নেটওয়ার্ক পূর্বানুমানযোগ্য হবে, ড্রেনেজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা সংরক্ষিত থাকবে এবং পরিবারগুলো নিয়ন্ত্রিত ভূমি ও আবাসন বাজারে অংশ নিতে সক্ষম হবে। কিন্তু বাস্তব শহরে রয়েছে অনানুষ্ঠানিক বসতি, নিবন্ধনহীন যানবাহন, ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা ভবন, বাড়িভিত্তিক মিশ্র ব্যবসা, রাস্তার বাণিজ্য, খণ্ডিত প্লট, দখল হওয়া খাল এবং বিপুল জনগোষ্ঠী, যাদের জীবিকা এমন সব ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল যেগুলোকে পরিকল্পনা নথি প্রায়ই অস্থায়ী, অনাকাঙ্ক্ষিত বা সমস্যা হিসেবে দেখে।
পরিকল্পনা যখন এসব বাস্তবতাকে কেবল নিয়মভঙ্গ হিসেবে দেখে, তখন অনানুষ্ঠানিকতার প্রকৃত অর্থই বোঝে না। অনেক ক্ষেত্রেই অনানুষ্ঠানিকতা হলো অনুপস্থিত বা অকার্যকর আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার জায়গায় বাজার ও সমাজের তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করা বিকল্প ব্যবস্থা। একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা থাকতে পারে কারণ নির্ভরযোগ্য ফিডার বাস নেই। একজন পথবিক্রেতা থাকতে পারেন কারণ আনুষ্ঠানিক দোকানঘরের ভাড়া তার নাগালের বাইরে, অথচ মানুষের সাশ্রয়ী খাবারের চাহিদা আছে। একটি অনানুষ্ঠানিক বসতি ঝুঁকিপূর্ণ জমিতে গড়ে উঠতে পারে কারণ কর্মসংস্থানের কাছাকাছি বৈধ আবাসন পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। অনুমোদনহীন মিশ্র ব্যবহার জনপ্রিয় হতে পারে কারণ ব্যবহারকে কঠোরভাবে আলাদা করার ধারণা একটি ঘনবসতিপূর্ণ দক্ষিণ এশীয় মহল্লার বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এর কোনোটির অর্থ এই নয় যে প্রতিটি অনানুষ্ঠানিক ফলাফল মেনে নিতে হবে। জলাভূমি ভরাট বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনিরাপদ ভবন মানুষের প্রাণ নিতে পারে। নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন পথচারীদের বিপদে ফেলতে পারে। পরিকল্পনার মূল কাজ হলো পার্থক্য করা: কোন বিষয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত, কোনটি নিয়মের আওতায় এনে বৈধ করা সম্ভব, কোনটির পুনর্নকশা প্রয়োজন, এবং কোন ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার আগে রাষ্ট্রকেই একটি কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা দিতে হবে।
ব্যর্থতা শুধু স্থানিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও
ঢাকার সমস্যাগুলো শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ের নিয়মভঙ্গের ফল নয়। খণ্ডিত রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বও এসব সমস্যা তৈরি করে। পরিবহন, ভূমি উন্নয়ন, ড্রেনেজ, সড়ক, আবাসন, ইউটিলিটি এবং স্থানীয় সরকার বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত, যাদের দায়িত্বের সীমানা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ সবসময় একে অন্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে ঢাকার খণ্ডিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে উন্নয়ন সহযোগীরাও দুর্বল নগর শাসনব্যবস্থাকে বারবার অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা সক্ষমতা ও সীমিত নাগরিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করেছে।[6]
এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশে একই সঙ্গে অত্যন্ত বিস্তারিত পরিকল্পনা বিধিমালা এবং গভীরভাবে অপরিকল্পিত নগর বাস্তবতা কীভাবে পাশাপাশি থাকতে পারে। কোনো পরিকল্পনায় একটি সড়কের জন্য জমি সংরক্ষিত থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেই জমি অধিগ্রহণে সক্ষম নাও হতে পারে। কোনো ড্রেনেজ করিডর পরিকল্পনায় চিহ্নিত থাকতে পারে, কিন্তু আইন প্রয়োগের আগেই তা ভরাট হয়ে যেতে পারে। একটি স্থানীয় সড়কের দায়িত্ব হয়তো সিটি করপোরেশনের, পাশের জমি নিয়ন্ত্রণ করে অন্য একটি সংস্থা, আর পরিবহন ব্যবস্থাপনা করে তৃতীয় আরেকটি প্রতিষ্ঠান। ফলে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণই পরিকল্পনা ব্যবস্থার সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ হয়ে ওঠে, কারণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করার চেয়ে একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করা তুলনামূলকভাবে সহজ।
এর ফলে এমন একটি পরিকল্পনা সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে, যা নিচের স্তরে শাস্তিমূলক কিন্তু ওপরের স্তরে আলোচনাসাপেক্ষ। ছোট বাড়ির মালিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা লাইসেন্স, জরিমানা ও উচ্ছেদের মুখোমুখি হন। অন্যদিকে, বড় ও প্রভাবশালী পক্ষগুলোর পক্ষে পরামর্শক নিয়োগ করা, সংশোধনী চাওয়া, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা কিংবা নিয়ম পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা অনেক সহজ। উন্নয়ন স্বার্থের চাপে ঢাকার ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে বারবার সংশোধনের বিষয়ে পরিকল্পনা পেশাজীবীরা প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সও রয়েছে।[7]
যখন নাগরিকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে ক্ষমতাবানদের জন্য নিয়ম নমনীয়, কিন্তু দুর্বলদের জন্য কঠোর, তখন পরিকল্পনা শুধু মানুষের নিয়ম মানার প্রবণতাই হারায় না। এটি তার বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতাও হারায়।
পরামর্শ গ্রহণ নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়
বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণ নিয়ে একটি পরিচিত ব্যঙ্গচিত্র আছে: ঢাকায় অল্প কয়েকজন পেশাজীবী একটি সমস্যা চিহ্নিত করেন, সেটি কোনো সেমিনার বা পত্রিকার গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা হয়, তারপর তা একটি প্রস্তাবে রূপ নেয়, এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি নিয়ম হিসেবে হাজির হয় যা লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর প্রযোজ্য, অথচ তারা কখনো সেই আলোচনার অংশই ছিলেন না। এই চিত্রটি কিছুটা অতিরঞ্জিত, কিন্তু এর পেছনের সমালোচনাটি যথেষ্ট গুরুতর।
বাংলাদেশে অবশ্যই আনুষ্ঠানিক এবং প্রকল্পভিত্তিক জনপরামর্শের ব্যবস্থা রয়েছে। রাজউক নিজেই বলেছে যে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিউনিটির অংশগ্রহণের মাধ্যমে হওয়া উচিত। তবে মহানগর পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বারবার অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধানের কথা উঠে এসেছে, যার মধ্যে রয়েছে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অসম সুযোগ।[8]
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কেবল একটি খসড়া প্রকাশ করা, কোনো হোটেলের সম্মেলনে বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো, কিংবা মূল সিদ্ধান্তগুলো আগেই নিয়ে ফেলার পর লিখিত আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়াকে অর্থবহ জনসম্পৃক্ততা বলা যায় না। কার্যকর অংশগ্রহণ তখনই শুরু হয়, যখন বিভিন্ন বিকল্প এখনো খোলা থাকে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রভাবিত মানুষের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সমস্যাটি বাস্তবে কীভাবে কাজ করে, প্রস্তাবিত সমাধানের খরচ কারা বহন করবে, কোন বিকল্পগুলো বাস্তবে সম্ভব, এবং নিয়ম মানতে হলে মানুষের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্য নিখুঁত গণতন্ত্রের কোনো আদর্শ উদাহরণ নয়, এবং ব্রিটিশ পরামর্শপ্রক্রিয়াও অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে কিংবা সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে। তবে এর প্রাতিষ্ঠানিক নীতিটি গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাবিনেট অফিসের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নীতিমালা যখন এখনো গঠনের পর্যায়ে থাকে তখনই পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত, এতে প্রভাবিত সব ধরনের গোষ্ঠীকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত, এবং শেষ পর্যন্ত গৃহীত নীতিতে পরামর্শের প্রতিক্রিয়াগুলো কীভাবে প্রভাব ফেলেছে তা ব্যাখ্যা করা উচিত।[9] ইংল্যান্ডে লোকাল প্ল্যান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও স্বাধীন পরীক্ষার আগে কমিউনিটির মতামত জানানোর আনুষ্ঠানিক ধাপ রয়েছে। বিষয়টি এমন নয় যে ব্রিটেনে প্রতিটি আইন করার আগে ‘শত শতবার’ পরামর্শ নেওয়া হয়। আসল বিষয় হলো, সেখানে পরামর্শ গ্রহণকে জনসিদ্ধান্তের বৈধতা ও প্রমাণভিত্তির অংশ হিসেবে দেখা হয়, ঐচ্ছিক সৌজন্য হিসেবে নয়।
বাংলাদেশের সদ্য অনুমোদিত জাতীয় নগর নীতি ২০২৫-এও এখন একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বিকেন্দ্রীভূত নগর প্রবৃদ্ধি, শক্তিশালী স্থানীয় শাসনব্যবস্থা এবং অর্থবহ নাগরিক অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসন, নগর দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নত সেবা প্রদানের কথাও বলা হয়েছে।[10] সরকারি চিন্তাধারায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এখন মূল পরীক্ষা হবে, নাগরিক অংশগ্রহণ বাস্তবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে কি না, নাকি তা শুধু সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবেই থেকে যায়।
গভীরতর সমস্যাটি হলো অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্ববাদ
এই যুক্তির একটি সামাজিক মাত্রাও রয়েছে, যা প্রচলিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এমন একটি সমাজের মধ্যে কাজ করে, যেখানে মর্যাদা, শিক্ষা, শ্রেণি, পেশা এবং ক্ষমতার কাছে প্রবেশাধিকারের ভিত্তিতে শক্তিশালী সামাজিক স্তরবিন্যাস বিদ্যমান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পেশাগত যোগ্যতাসম্পন্ন নাগরিকের মধ্যে সহজেই এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে তার বিশেষজ্ঞ জ্ঞান শুধু তাকে কারিগরি বিষয়ে দক্ষতা দেয় না, বরং অন্য সবাই কীভাবে জীবনযাপন করবে তা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রেও তাকে অধিকতর নৈতিক বা সামাজিক অধিকার দেয়।
কখনো কখনো এই প্রবণতাকে বাংলার ধর্মীয় ইতিহাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, কিংবা বলা হয় যে সমকালীন কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা হিন্দু বর্ণব্যবস্থার অবশিষ্টাংশ। এই ব্যাখ্যা অতিরিক্ত সাম্প্রদায়িক এবং একই সঙ্গে অতিসরল। বাংলার সামাজিক স্তরবিন্যাস গড়ে উঠেছে একাধিক পরস্পর-সম্পর্কিত ব্যবস্থার প্রভাবে: বর্ণব্যবস্থা, জমিদারি, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র, শ্রেণি, গ্রামীণ পৃষ্ঠপোষকতার সম্পর্ক এবং পরবর্তীকালে দলীয়-রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নেটওয়ার্ক। এসব কাঠামোর সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষই যুক্ত ছিল। তাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য ধারাবাহিকতা হলো কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে ‘হিন্দু আচরণ’ টিকে থাকার ধারণা নয়। বরং এটি পিতৃতান্ত্রিক বা অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্ববাদের স্থায়িত্ব, অর্থাৎ যাদের সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতা বেশি, তারাই কম ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের হয়ে ‘জনস্বার্থ’ কী, তা নির্ধারণ করতে পারেন এমন ধারণা।
এই অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্ববাদ প্রক্রিয়াগত গণতন্ত্রের সঙ্গে বেশ স্বচ্ছন্দে সহাবস্থান করতে পারে। নির্বাচন হয়, সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, কমিটি গঠিত হয়, পরামর্শপত্র প্রকাশ করা হয়, কিন্তু গ্রহণযোগ্য ফলাফলের সীমা নির্ধারণ করে দেয় তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ একটি পেশাজীবী ও রাজনৈতিক শ্রেণি। জনগণের মতামত যখন অভিজাতদের বিচারবোধকে সমর্থন করে, তখন তা স্বাগত জানানো হয়। আর যখন তা ভিন্নমত প্রকাশ করে, তখন তাকে অজ্ঞতা, জনতুষ্টিবাদ কিংবা আইনহীনতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
এটি বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি নয়। একটি ভবন কাঠামোগতভাবে নিরাপদ কি না, তা নির্ধারণ করা উচিত একজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের। ব্রেকিং ডিস্ট্যান্স বিশ্লেষণ করা উচিত একজন পরিবহন প্রকৌশলীর। রোগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া উচিত একজন মহামারিবিদের। কিন্তু কারিগরি কর্তৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ব এক বিষয় নয়। বিশেষজ্ঞরা কোনো সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য ফলাফল, ঝুঁকি এবং বাস্তব সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করতে পারেন। কিন্তু সেই বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে নীরবে এমন একটি ক্ষমতায় রূপ দেওয়া উচিত নয়, যার মাধ্যমে তারা ঠিক করবেন কার অসুবিধা, কার জীবিকা হারানো কিংবা কার বাস্তুচ্যুতি গ্রহণযোগ্য।
মানবিক পরিকল্পনা কেমন হতে পারে
আরও কার্যকর একটি বাংলাদেশি পরিকল্পনা ব্যবস্থা অবশ্যই নিয়ম প্রণয়ন করবে। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো আজকের তুলনায় আরও কঠোরভাবেই সেই নিয়ম প্রয়োগ করবে। পার্থক্যটি হবে মূলত কাজের ক্রমে।
প্রথমত, নিষেধাজ্ঞার আগে সমস্যাটি সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হবে। কোনো এলাকায় যদি ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রধান পরিবহনমাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে আগে বুঝতে হবে তারা কোন ধরনের যাত্রার চাহিদা পূরণ করছে, কত মানুষের জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল, কোন সড়কে এগুলো ঝুঁকি তৈরি করছে এবং আনুষ্ঠানিক গণপরিবহনের কোন ঘাটতি তারা পূরণ করছে। যদি হকাররা ফুটপাত দখল করে বসেন, তাহলে উচ্ছেদকে স্বাভাবিক সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে পথচারীদের সমস্যা এবং স্থানীয় খুচরা অর্থনীতির বাস্তবতা বুঝতে হবে। যদি পরিবারগুলো অনুমোদন ছাড়া ঘরবাড়ি নির্মাণ করে, তাহলে প্রতিটি অননুমোদিত স্থাপনাকে বিচ্ছিন্ন নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখার বদলে জমির দাম, মালিকানার ধরন, প্লটের মানদণ্ড এবং আবাসন ঋণে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয়গুলো পরীক্ষা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বৈধতার দিকে যাওয়ার বাস্তব পথ তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষের জন্য নিয়ম মেনে চলার বাস্তবসম্মত সুযোগ থাকলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বেশি কার্যকর হয়। এর অর্থ হতে পারে সহজতর অনুমোদন প্রক্রিয়া, স্বল্পমূল্যের নিবন্ধন, অনুমোদিত মানসম্মত নকশা, ধাপে ধাপে সময়সীমা, ক্ষুদ্রঋণ, অতীতের ছোটখাটো নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমা বা নিয়মিতকরণের সুযোগ, নির্ধারিত হকার এলাকা, ধাপে ধাপে বাড়ি নির্মাণের উপযোগী বিল্ডিং কোড, কিংবা কম গতির যানবাহনের জন্য রুটভিত্তিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা।
তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগে পার্থক্য করতে হবে। সচেতনভাবে বাণিজ্যিক নিয়মভঙ্গ, দুর্নীতি, বিপজ্জনক নির্মাণ এবং পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি থাকা উচিত। অন্যদিকে, দারিদ্র্য বা বেঁচে থাকার প্রয়োজন থেকে সৃষ্ট কারিগরি ধরনের নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে, যেখানে জননিরাপত্তা তা অনুমোদন করে, শাস্তির আগে সহায়তা ও বৈধ ব্যবস্থায় রূপান্তরের সুযোগ দেওয়া উচিত। এই নীতির অর্থ শিথিলতা নয়। এর অর্থ আনুপাতিকতা।
চতুর্থত, অংশগ্রহণকে পরিকল্পনার আরও প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। বাসিন্দা, চালক, হকার, নারী, প্রতিবন্ধী মানুষ, নিম্নআয়ের ভাড়াটিয়া, ভূমির মালিক, ব্যবসায়ী এবং শিশুরা যেন শুধু পরিকল্পনার খসড়া তৈরি হওয়ার পর আলোচনায় আসে, তা যথেষ্ট নয়। সমস্যাটি কী, সেটি সংজ্ঞায়িত করার পর্যায় থেকেই তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে। একজন পরিকল্পনাবিদ যদি কেবল সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া একটি প্রস্তাব মানুষ সমর্থন করে কি না, সেটিই জানতে চান, তাহলে তিনি ইতোমধ্যেই অনেক দেরিতে পৌঁছেছেন।
পঞ্চমত, পরিকল্পনাকে সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নগর শৃঙ্খলাকে পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে আলাদা করা যায় না। কোনো পরিবারের আয় সহায়তা না থাকলে তারা কোনো না কোনোভাবে জীবিকার পথ খুঁজবেই। আনুষ্ঠানিক আবাসনের খরচ কোনো শ্রমিকের নাগালের বাইরে হলে তাকে কোথাও না কোথাও বসবাস করতেই হবে। কোনো যাত্রীর জন্য বাস না থাকলে সে অন্য কোনো যানবাহন ব্যবহার করবে। বৈধ বিকল্প যদি কাঠামোগতভাবেই মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে আইন প্রয়োগ মানুষকে শুধু এক ধরনের অবৈধতা থেকে আরেক ধরনের অবৈধতার দিকে ঠেলে দেয়।
সবশেষে, পরিকল্পনার সাফল্য নথি দিয়ে নয়, মানুষের আচরণ ও বাস্তব ফলাফল দিয়ে বিচার করতে হবে। একটি পরিবহন নীতির মানদণ্ড এই নয় যে বিধিমালাটি কত সুন্দরভাবে লেখা হয়েছে, বরং মানুষ নিরাপদ ও সাশ্রয়ীভাবে চলাচল করতে পারছে কি না। একটি ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মানদণ্ড এই নয় যে মানচিত্রে কতটা নিখুঁতভাবে বিভিন্ন এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে, বরং বাস্তবে উন্নয়ন সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করছে কি না এবং তা করতে গিয়ে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না। একইভাবে, জনপরামর্শের সাফল্য কতটি সভা হয়েছে তা দিয়ে মাপা উচিত নয়, বরং নাগরিকেরা স্পষ্টভাবে বলতে পারছেন কি না যে তাদের অংশগ্রহণ কোথায় এবং কীভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনেছে।
১১ বছরের শিশুটিও একটি পরিকল্পনার প্রশ্ন
একটি ইজি বাইকে থাকা ১১ বছরের শিশুর ঘটনাকে নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়তো অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। বাস্তবে, দুটিই একই ব্যবস্থার অংশ।
ছেলেটির সেই যাত্রা একাধিক ঘাটতির সম্মিলিত ফল: অসুস্থ বাবা, অনিশ্চিত পারিবারিক আয়, সীমিত সামাজিক সুরক্ষা, অনানুষ্ঠানিক পরিবহন অর্থনীতি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, কম খরচে চলাচলের বাজারচাহিদা, এবং এমন একটি রাষ্ট্র যার সঙ্গে ওই পরিবারের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সম্পর্ক হয়তো সেই নিয়মটিই, যা শিশুটিকে বলে সে কী করতে পারবে না।
নগর পরিকল্পনাকে প্রায়ই ভূমি, সড়ক, ভবন ও অবকাঠামোর বিন্যাস হিসেবে শেখানো হয়। কিন্তু এর সর্বোত্তম রূপ আরও বিস্তৃত: সীমিত সম্পদ এবং পরস্পরবিরোধী অধিকারের বাস্তবতায় সম্মিলিত জীবনকে সংগঠিত করার প্রক্রিয়া। এজন্য প্রকৌশল, আইন ও অর্থনীতি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নৈতিক বিবেচনাও। কোনো কার্যক্রম অনুমোদিত কি না, শুধু সেই প্রশ্ন করলেই যথেষ্ট নয়। জানতে হবে, সেটি কেন বিদ্যমান, কারা এর ওপর নির্ভরশীল, কারা এর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি বৈধ বিকল্প তৈরি করতে কতটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে।
অনিরাপদ গাড়ি চালানো, অবৈধ নির্মাণ বা দখলকে স্বাভাবিক করে বাংলাদেশ শৃঙ্খলাপূর্ণ হবে না। কিন্তু জরিমানাকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প হিসেবে ধরে নিলেও শৃঙ্খলা আসবে না। রাষ্ট্রের এমন পর্যাপ্ত কর্তৃত্ব প্রয়োজন, যাতে সে আইন প্রয়োগ করতে পারে; এমন সক্ষমতা প্রয়োজন, যাতে সে প্রয়োজনীয় সেবা ও বিকল্প দিতে পারে; এবং এমন বিনয়ও প্রয়োজন, যাতে সে মানুষের কথা শুনতে পারে।
একটি সফল রাষ্ট্র সাদা ও কালোর মধ্যে একটি কঠোর রেখা টেনে তার বাইরের সবকিছুকে অপরাধ বলে ঘোষণা করে না। আবার সহানুভূতির নামে প্রতিটি নিয়মকেও অর্থহীন করে দেয় না। বরং সে সুপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত ধূসর ক্ষেত্র তৈরি করে: বিবেচনাধিকার, রূপান্তরের সময়, ব্যতিক্রম, সহায়তা, আলোচনা এবং আনুপাতিক আইন প্রয়োগ। এগুলো আইনের শাসনের দুর্বলতা নয়। সঠিকভাবে নকশা করা হলে, মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েও আইনের শাসনকে টিকিয়ে রাখার উপায় এগুলোই।
চুরি হয়ে যাওয়া সেই ইজি বাইকের ঘটনাটি আমাদের এই শিক্ষাই দেয়। একই শিক্ষা বাংলাদেশের পরিকল্পনাবিদেরা বহু দশক ধরে ঢাকার রাস্তা থেকে ধীরে ধীরে এবং অনেক মূল্য দিয়ে শিখছেন। শুধু জরিমানা করে কোনো দেশ বৈধতা অর্জন করতে পারে না। সেই বৈধতা অর্জন করতে হয় পরিকল্পনার মাধ্যমে।
Sources and notes:
1. Government of Bangladesh, Road Transport Act 2018, section 6. The statutory licensing provisions set a minimum age of 18 for a non-professional driving licence. Laws of Bangladesh: https://bdlaws.minlaw.gov.bd/act-1262/section-47858.html
2. Prothom Alo English, “Govt to approve BUET-designed new rickshaw…”, 29 April 2025. The report describes the move towards e-registration, driver licensing and a BUET-designed safer battery-rickshaw model, and notes the longstanding regulatory gap. https://en.prothomalo.com/bangladesh/city/q0u0lowpyx
3. Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights, “OHCHR and the rights to water and sanitation”. https://www.ohchr.org/en/water-and-sanitation
4. The Daily Star, “Regulating battery-run rickshaws”, 4 October 2025. https://www.thedailystar.net/law-our-rights/law-vision/news/regulating-battery-run-rickshaws-4001906
5. World Bank, Toward Great Dhaka: A New Urban Development Paradigm Eastward, 2018; and Bangladesh Country Environmental Analysis, 2018. The latter identifies limited local-level planning capacity as a driver of unplanned urbanisation.
6. World Bank, Toward Great Dhaka, 2018; Asian Development Bank urban governance programmes in Bangladesh, including work identifying weak urban governance, planning capacity and citizen participation as linked constraints.
7. Prothom Alo English, “Govt will be held responsible if DAP revised under pressure”, 19 March 2025; The Business Standard, reporting concerns from urban planners about amendments to the Detailed Area Plan, 4 December 2024.
8. RAJUK, Detailed Area Plan information; M. S. H. Swapan, “Realities of community participation in metropolitan planning in Bangladesh”, Habitat International 43 (2014), 191–197; related research on participatory urban governance in Bangladesh.
9. UK Cabinet Office, Consultation Principles, updated 19 March 2018. https://www.gov.uk/government/publications/consultation-principles-guidance/consultation-principles-2018
10. UNDP Bangladesh, “Government Approves National Urban Policy 2025”, 2 January 2026. The policy promotes decentralised urban growth, local governance, meaningful citizen participation, affordable housing and social protection for the urban poor. https://www.undp.org/bangladesh/news/government-approves-national-urban-policy-2025
Personal note: the classroom account concerning the water tanker in Gujarat is presented as the author’s recollection of a University of Sheffield teaching discussion, not as a reported incident independently verified for this article.
মুরশেদ আহমদ যুক্তরাজ্যভিত্তিক একজন সিনিয়র নগর পরিকল্পনাবিদ এবং রয়্যাল টাউন প্ল্যানিং ইনস্টিটিউটের চার্টার্ড সদস্য।
© 2026 Groundwork. All rights reserved.
